প্রায় একঘণ্টা ধরে ছত্রপতি শিবাজী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের লাউঞ্জে বসে শৌনক অপেক্ষা করছে দিল্লীর ফ্লাইটের জন্য। প্রবল বৃষ্টির দরুন ফ্লাইট একঘণ্টা লেটে ছাড়বে। কিন্তু শৌনক দিল্লীতে তাড়াতাড়ি যেতে চায়। শৌনকের বন্ধু ইউসুফ লাউঞ্জের গেটের দরজার কাঁচ দিয়ে রানওয়ে প্যাসেজে বৃষ্টি পড়া দেখছে। কিছুক্ষণ আগে অ্যানাউন্সমেন্ট হল আরও একঘণ্টা লেট হবে ফ্লাইট ছাড়তে।
কিছুটা বিমর্ষ, নিশ্চুপ হয়ে লাউঞ্জের সিটে বসে শৌনক হারিয়ে গেল তার পুরনো স্মৃতির ভেতরে, তার সামনে ভিড় করে এলো একের পর এক ঘটনা। এইরকমই এক বৃষ্টিপড়া রাতে অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে ল্যাপটপ স্টার্ট দিয়ে ফেসবুক খোলে। শৌনকের রুমমেট ইউসুফের সেদিন দেরি হচ্ছিল ফিরতে। এটা সেটা পোস্ট নাড়াচাড়া করার পরই দেখতে পেল অনিন্দিতার হাতে আঁকা ছবি আর সঙ্গে ওর নিজের স্বরচিত একটা কবিতা। শৌনক আঁকতে পারে না কিন্তু আঁকার সে খুব অনুরাগী। আঁকা আর লেখাটাও বেশ ভাল হয়েছিল, শৌনক খুব আকৃষ্ট হয়েছিল। সে একটা কমেন্ট দেয় তারপর ইউসুফ চলে আসাতে ল্যাপটপ বন্ধ করে দেয়। টুকটাক কথা বলে ইউসুফ ফ্রেশ হতে গেলে শৌনক বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। বাইরে তখনও ঝমঝম করে অঝোরে বৃষ্টি পড়ে চলেছে। লোখ্যান্ডবালা কমপ্লেক্সের কালো রাস্তাটায় বৃষ্টির ঢেউ দেখতে শৌনকের ভারী ভাল লাগে। কমপ্লেক্স গ্রাউণ্ডের মধ্যেই একটা ছোট বাগান আছে পাঁচতলার ওপর থেকে বাগানটা বৃষ্টিতে দেখতে খুব সুন্দর লাগছিল। এভাবে যে কতক্ষণ কেটে যায় শৌনক তা বুঝতে পারে না । ইউসুফ এসে ডাইনিং টেবিলে খাবার সার্ভ করে ডাকতে শৌনক সম্বিৎ ফিরে পেল। সেদিন ইউসুফ শৌনককে দেখে জিজ্ঞেস করেছিল কি হয়েছে। শৌনক কিছু হয় নি বলে কথা ঘুরিয়ে অন্যপ্রসঙ্গে গেলেও কিন্তু ওই লেখা আর আঁকা ছবি এমনভাবে ওর মনে গেঁথে যায়, এমন স্পেলবাউণ্ড হয়ে যায় যে রাতে ঘুমের মধ্যেও সে ওই ছবি দেখতে থাকে।
পরদিন অফিস ফিরেই আবার ল্যাপটপ খুলে বসে পড়ে। সাধারনত অফিসে দৌড়াদৌড়ি করে আর কম্পিউটার ঘেঁটে মাথাটাই ঘ হয়ে যায়। তাই বাড়ি ফিরে শৌনকের আর এনার্জী লাগে না ল্যাপটপ নিয়ে বসার। সেদিন ওই পোস্টের অদ্ভুত মোহে আবিষ্ট হয়ে ল্যাপটপ অন করে ফেসবুক খুলে বসল। আজ আর পোস্ট দেখলা না সরাসরি অনিন্দিতার প্রোফাইলে গিয়ে পোস্ট দেখল। নতুন একটা আঁকা আর ওর স্বরচিত কবিতা পোস্ট করা হয়েছে দুপুরবেলায়। শৌনকের খুব লোভ হল অনিন্দিতার সাথে পরিচয় করে। এই কদিন আগে এড হয়েছে মেয়েটা। শৌনক হাই টাইপ করে মেসেজ দিয়ে বসে থাকে ওপাশ থেকে সাড়া পাবার আশায়। প্রায় দশ মিনিট পর মেসেজ এল। শুরু হল আলাপচারিতা। অনতিবিলম্বে সম্পর্কে নিগুঢ়তা আসে, চলে ভাববিনিময়। রোজ একটা রুটিনে দাঁড়িয়ে গেল শৌনকের, অফিস থেকে ফিরেই সে বসে পড়ত। এই আলাপচারীতা থেকে বন্ধুত্ব ও তারপরে ভালবাসায় উত্তরণ হল ওদের সম্পর্ক। এভাবে যে ছটা মাস কেটে গেল তা না শৌনক না অনিন্দিতা বুঝে উঠতে পারল। একদিন অফিস থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে ল্যাপটপ খুলতে যাবে ঠিক তখনি আমতা থেকে বাবার মৃত্যুসংবাদ জানাতে কাকার ফোন আসে। শৌনক তড়িঘড়ি আমতা ফিরে আসে। বাবার কাজ শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় জায়গা-জমি নিয়ে পারিবারিক অশান্তি। বাড়ির আর বাইরের নানান কাজে ব্যস্ত থাকায় অনিন্দিতার সাথে আর যোগাযোগ করা হয় না শৌনকের। একদিন অফিসে লিভ এক্সটেন্ড করার জন্য অ্যাপ্লিকেশন লেটার মেল করতে গিয়ে লগ ইন করতেই দেখতে পায় অনিন্দিতার মেল। কিছুক্ষণ মেলের দিকে চুপ করে বসে থাকে শৌনক। বাবা হঠাৎ মারা যাওয়ায় আর এই কয়দিনের ছোটাছুটিতে শৌনক খুব বিমর্ষ হয়ে পড়ে। তার নাওয়া-খাওয়ারও আর ঠিক থাকে না।
-- ‘কি রে চুপ করে কি ভাবছিস বল তো সেই থেকে , আমরা যাচ্ছি তো সব ঠিক হয়ে যাবে দেখিস’।
ইউসুফ শৌনকের পাশে বসতে বসতে বলল।
--‘ কিছু খবর পেলি রে আর কতক্ষণ আমাদের এভাবে বসে থাকতে হবে ? সবই কপাল – না, ঠিক কপাল
নয়, সব আমারই দোষ। আমার দোষে আজ এরকম হল। এরকম একটা দিন আসবে কোনোদিন ভাবিনি
রে’।
কিছুটা হতাশা নিয়ে কথাগুলো বলেই শৌনক হাতের কনুইদুটো দুপায়ে ভর দিয়ে নিজের হাতে মুখ
ঢাকল। ইউসুফও শৌনককে এরকমভাবে দেখে চোখ পাশের দিকে ঘুরিয়ে বৃষ্টি দেখতে লাগল। শৌনক আর ও একসঙ্গে ঢুকেছিল কোম্পানিতে। কোনদিন ওদের বন্ধুত্বে ভুল বোঝাবুঝি হয় নি এতটুকুও। বাড়ি ছেড়ে এতদূর এসে একসঙ্গে থাকার ফলে একা হতে হয় নি কখনও ওদের কাউকে। শৌনককে হতাশ হতে দেখে ইউসুফের ভেতরটাও কাঁদছিল। ও তাই কিছু জবাব দিতে পারছিল না গলা জড়িয়ে এসেছিল। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে দুজনে থাকার পর ইউসুফই প্রথম মুখ খুলে শৌনককে জিজ্ঞাসা করে –
-- ‘এই কয়মাসে কি হল যে আজ এরকম একটা দিন আসল যে একটা ফোন কল পেয়েই তোকে চাকরীতে রিসাইন দিয়ে ছুটতে হচ্ছে –তাও যখন তোর প্রমোশনের সময়! লারসেন এন্ড টার্বোর ইনফোটেকের প্রজেক্ট ম্যানেজার এর চাকরির তুই স্বপ্ন দেখতিস। এই কোম্পানির হেড অফিসে থেকে এইরকম একটা পজিশন পেতে চলেছিস আর কিছুদিন পরেই আর তুই কিনা সব ছেড়ে দিল্লী চললি! একবার ভেবে দেখ শৌনক, ফিরে চল’।
-- ‘তুই যদি ফিরে যেতে চাস যা , আমার ভাবা হয়ে গেছে আমি কি চাই’।
--‘ তোকে একা এরকম একটা মানসিক অবস্থায় ছেড়ে কিভাবে যাই বল তো। তুই আমার সবথেকে ভাল বন্ধু। ফোনকল পাবার পর থেকে তুই যেন কেমন একটা হয়ে গেলি। জিজ্ঞাসা করলে কিছু বললি না। তোকে ওই অবস্থায় দেখে বুঝেছি যে কিছু একটা হয়েছে তাই তো তড়িঘড়ি লিভ নিয়ে চলে এলাম তোর সাথে’।
- ‘তুই যদি ভাবিস আমার সাথে এসে তুই ভুল করেছিস তাহলে ফিরে যেতে পারিস। আমার কাউকে দরকার নেই। ভুল আমি আগে করেছিলাম এখন শুধরে নেবার সময় এসছে’।
-- ‘ওভাবে বলিস না শৌনক। তুই আমি সেই পনের বছর ধরে একসাথে আছি একই রুম শেয়ার করি। তুই বন্ধুর থেকেও বেশিকিছু আমার কাছে। ছোট বয়সে ভাই মারা যাওয়ার পর একা বড় হয়েছি তোকে পেয়ে আমি সেই ভাইয়ের অভাব ভুলে গেছি’।
--‘ কিছু মনে করিস না। আমার এখন মাথার ঠিক নেই’—শৌনক ইউসুফের দিকে না তাকিয়েই দুহাতে মুখ ঢেকে বলতে শুরু করল—
--‘ বাবা মারা যাওয়ার পর আমার মাথা কাজ করছিল না। ছোটবেলায় মাকে হারিয়ে আমি বাবার কোলেপিঠেই বড় হয়েছি। বাবা একাধারে যেমন ছিলেন একজন ভাল বন্ধু তেমন গার্জেনও। এই কোম্পানির হেড অফিসে চাকরি পাওয়াটা ছিল আমার স্বপ্ন। আমার খুব ইচ্ছা ছিল বাবা আমার সাথে মুম্বাই এসে থাকে তাই জয়েনিং লেটার পেতে বাবাকে যখন জানালাম বাবা আমাকে বললেন-‘চাকরিতে প্রথম জয়েন করবি কোথায় কি থাকতে হবে তার ঠিক নেই আমাকে নিয়ে গিয়ে আর এক বিপদে পড়বি তার থেকে তুই যা গিয়ে দেখে শুনে সেটল কর। আমি দূরে হলেও তোর পাশেই সবসময় থাকব তাছাড়া তোর মায়ের স্মৃতি বুকে রেখেই এতগুলো বছর পার করলাম। প্রত্যেকটা জিনিসে তার ছোঁয়া আছে। কাছে না থাকলেও জানি সে পাশে আছে। এখান থেকে গেলে আমি আর তাকে পাব কই। তাকে ছেড়ে কিভাবে যাই বল। তুই যা এটা তোর স্বপ্ন, তুই পূরণ কর। তোর মা থাকলে আজ তোর মাও খুব খুশি হতেন আজ তোকে দেখে’।–এরপর আর কিছু বলতে পারি নি কিন্তু এখানে এসেও বাবার সাথে আমার বন্ধন অটুট ছিল।
--‘হ্যাঁ, তোকে দেখেছি দূর থেকে যতটা খেয়াল রাখা যায় তুই রাখতিস। আমি তোকে দেখে ভাবতাম কে বলে ছেলেরা দূরে পাড়ি দিলে বাবা মাকে ভুলে যায়’।
শৌনক আবার নিজের খেয়ালে বলতে শুরু করে – ‘আমতায় গিয়ে শুনলাম বাবা ২ বছর ধরে স্টমাক ক্যান্সারে ভুগেছে। আমাকে জানাতে বারণ করেছিলেন তাই কেউ জানায় নি। আমি গেলে বাবা আমাকেও বুঝতে দেন নি। ঘুণাক্ষরেও আমি টের পাইনি ভেতর ভেতর বাবার এত বড় অসুখ। খুব ভেঙে পড়েছিলাম বাবার মৃত্যুসংবাদে। এতটাই ভেঙে পড়েছিলাম যে আমার অণু আমার অনিন্দিতাকে আর সময় দিতে পারলাম না। কিছু ভাল লাগত না জানিস শুধু বাবার কথা ভাবতাম আর ভাবতাম আমি অনাথ হয়ে গেলাম। অণু ফোন করলেও ঠিক করে কথা বলতাম না। ওকে ডিরেক্ট অ্যাভয়েড করতে লাগলাম। কোন কোনদিন ফোনও পর্যন্ত তুলতাম না’।
-- ‘অনিন্দিতা তোর খবর না পেয়ে তোর খোঁজে একদিন আমার কাছে এসেছিল কিন্তু আমি নিজেই তখন তোর কোন খবর না পেয়ে ওরিড ছিলাম। ওকে বলেছিলাম খবর পেলে জানাব। তোকে ফোন করে পেতাম না। যদিবা একদিন ফোন পেলাম তোর কাকা ফোন তুলে বললেন যে তুই নেই তোর সাথে ওনাদের কোন যোগাযোগ নেই। আমি যেন আর ওই নাম্বারে ফোন না করি বলে লাইন কেটে দিলেন’।
--‘কাকার মত অপদার্থ দেখিনি । বাবার শরীর খারাপের সময় বাবার দিয়ে জায়গা-জমি সব লিখিয়ে নিয়েছে। অথচ এই কাকাকেই বাবা নাকি ছোটবেলায় মানুষ করেছেন। বাবার কাজের পর ওই নিয়ে অনেক দৌড়াদৌড়ি করলাম কিন্তু কিছু হল না। একে বাবা নেই আর বাবার স্মৃতিটাও হাতছাড়া হয়ে গেল। তখন কি যে মাথায় ঢুকেছিল ক্রমাগত অণুকে অ্যাভয়েড করতে লাগলাম। মেয়েটা আমাকে প্রচুণ্ড ভালোবাসতো, আমিও খুব ভালবাসতাম। অমন ভালবাসা কোথাও কেউ পেয়েছে কিনা আমার জানা নেই। কি ভালই না বাসতে পারে মেয়েটা। আমার শত অ্যাভয়েড সত্ত্বেও অণু আমার সাথে অ্যাটাচড থাকতে চাইত। ক্রমে ওর দিনরাত আমায় নিয়ে বা অ্যাভয়েড করার কারণ নিয়ে ভাবনা জুড়ে থাকত। ফোন করলে জানাত কিন্তু আমি এমন অন্ধ ছিলাম যে বুঝিনি, স্বার্থপরের মত নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। আমি বুঝতে পারতাম মেয়েটা ভেঙ্গে পড়ছে আমার কাছ থেকে অমন ব্যবহার পেয়ে কিন্তু বিশ্বাস কর আমার তখন মাথার ঠিক ছিল না। আমি বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ এমনকি নাম্বারও ব্লক করে দিয়েছিলাম। আমি শুধু একা থাকতে চাইতাম। একদিন মেল খুলে দেখলাম মেসেজ দিয়েছিল ওর শরীর ভাল না ও আমার ব্যবহারে হতাশ হয়ে বাড়িতে মজুত সব ট্যাবলেট খেয়ে নিয়েছে। আমি ব্লক খুলে ওর কাছে গেলাম কিন্তু বিমর্ষ হতাশ আমার আমিকে কিছুতেই ওর কাছে বদলাতে পারলাম না। আবার অ্যাভয়েড করতে শুরু করলাম। শুধু একা থাকতে চাইতাম আর কিছু না’।–এইবলে শৌনক চুপ করে গেল, ইউসুফ দেখল শৌনকের চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। ইউসুফ ওর পিঠে হাত রেখে সান্ত্বনা দিতে গেল এমন্সময়ে অ্যানাউন্সমেন্ট শোনা গেল ফ্লাইট আসার। ইউসুফ শৌনকের দিকে তাকিয়ে বলল –‘ নে মুখটা মোছ এবার, চল অ্যানাউন্সমেন্ট হয়ে গেছে । আমাদের এবার উঠতে হবে’।
ফ্লাইটের উইন্ডোসিট পেয়ে দুজনে বসে পড়ল। রানওয়ে প্যসেজ থেকে ফ্লাইট টেক অফ করল। বাইরে তখনও ঝিরিঝিরে বৃষ্টি হয়ে চলেছে। ফ্লাইটের নিচে ধূসর মেঘপুঞ্জ থেকে মাঝে মাঝেই বিদ্যুতের ঝলকানি দেখা যাচ্ছে। ইউসুফ সিটপকেট থেকে ম্যাগাজিন নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে যথাস্থানে রেখে শৌনকের দিকে তাকাল। শৌনক উইণ্ডোর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ইউসুফ বন্ধুর হাতের ওপর হাত রেখে সান্ত্বনার দেবার মত করে বলল- এত ভেঙে পড়িস না, দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। অনিন্দিতার বাবা-মায়ের কথা একবার ভাব তো ওদের একমাত্র সন্তান আজ মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে’।
--‘তুই কি ভাবছিস অণুর বাবা মা আমাকে ছেড়ে দেবেন? ওদের মেয়ের আজ এরকম পরিস্থিতির জন্য একমাত্র আমি দায়ী, আমি’।
--এরকম ভাবিস না। ওপরওয়ালা হয়তো এটাই চেয়েছেন তাঁর ইচ্ছার কাছে আমি তুই কতটাই বা কি করতে পারি!’
-- ‘আমতার পার্ট চুকিয়ে যখন মুম্বাই ফিরে এলাম অনিন্দিতা আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছিল। একদিকে হতাশা আর অন্যদিকে অফিসের পেন্ডিং কাজের প্রেশারে অণুকে আর সময় দেওয়া হয় নি। একা থাকতে চাইতাম আর নিজের মধ্যেই সবসময় ডুবে থাকতাম, কাজের মধ্যে থাকতাম সারাদিন। আমি আমতা থেকে ফিরে এসে শুনলাম তোকে কয়েকমাসের জন্য ব্যাঙ্গালোরে পাঠিয়েছে। এদিকে অণু আমাকে প্রথম প্রথম ওর ভালোবাসা দিয়ে আমাকে রিকভার করাতে চাইত কিন্তু ক্রমাগত আমার কাছ থেকে অ্যাভয়েড পায় মেয়েটা। এরপর ওর বাবা মুম্বাই থেকে ট্রান্সফার করে দিল্লীতে। ওরা সবাই দিল্লীতে শিফট করে। অণু দিল্লী থেকেই যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করত আর আমি ভালবাসা পেয়েও তাচ্ছিল্য করতাম। আসলে অণু আমাকে নিয়ে ক্রমাগত ভাবতে ভাবতে এমন অসুখ বাঁধাল। আমি জানতাম অণু হার্ট পেসেন্ট ওর হার্ট কমজোরি আছে। মাঝে মাঝে বলত আমার ওপর অভিমান করে আপাদমস্তক ঠাণ্ডা জলে ভিজিয়ে রাতে শুয়ে পড়ত। গরমে রাতে স্নান করে এসি চালিয়ে শুয়ে থাকত ভিজে অবস্থায় । এরকম পাগলামি করত আর আমি কান দিতাম না সেসবে। এটা তো একরকম আত্মহত্যার চেষ্টাই করত বলা চলে। আমার একটু ভালোবাসার ছোঁয়া পেলেই মেয়েটাকে আর মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে হত না আজ। তখন কেন বুঝলাম না- আমি একটা রাবিশ একেবারে’— এই বলে শৌনক নিজের মুঠোহাতটাকে সিটের হ্যান্ডেলে জোরে একটা আঘাত করল। পাশের সিটের প্যাসেঞ্জার উঠে ব্যাপারটা বোঝার জন্য ঘুরে তাকাতে লাগল দেখে ইউসুফ সবাইককে বসিয়ে ব্যাপারটা ম্যানেজ করে বলল- ‘এখন তোর ভেবে কি হবে যখন ভাবার ছিল তখন ভাবলি না। এবার কর্মফল তো ভোগ করতেই হবে তাই না।‘
--‘সেই তো । কথাটা ঠিক বলেছিস ইউসুফ। তুই বিশ্বাস কর আমি অণুকে ফিরে পেতে চাই। ওকে আর এরকম করতে দেব না। সবসময় আগলে রাখব শুধু অণু ফিরে আসুক’।
--‘ আমিও সেটাই চাই। হ্যাঁ রে শৌনক কাল ওর মা তোকে ফোনে কি বলছেন? অনিন্দিতা কোথায় এডমিট আছে সেকথা কিছু বলেছেন? জায়গাটা কোথায় এয়ারপোর্ট থেকে কতদূর সেসব কিছু জানিয়েছেন?’
-- ‘ফোনটা রঙ নাম্বার ভেবে কেটে দিতেই যাচ্ছিলাম হঠাত অণুর নাম বলতে বুঝতে পরলাম। নার্সিংহোমটা এয়ারপোর্ট থেকে বেশি দূরে নয়। একটা ট্যাক্সি নিয়ে নাম বললেই পৌঁছে দেবে গেটের সামনে। উনি বললেন অণুর মেজর হার্ট অ্যাটাক করেছে। মিত্তল হসপিটাল এন্ড নার্সিংহোমে আইসিইউ তে আছে, ভেন্টিলেশনে। মাঝে মাঝে আমার নাম করছে। ওর মোবাইল থেকে আমার নাম্বার পেয়ে তবে আমায় ফোন দিতে পেরেছেন’।
-- ‘অনিন্দিতা তোর মত এক পাষাণকে ভালোবেসে মরতে বসেছে আর তুই বুঝলি না। আমার তোর ওপর এখন খুব রাগ হচ্ছে। এসব হয়েছে আমি কিছুই জানি না। ভাগ্যিস আজই ফিরলাম তাই জানতে পারলাম’।
মিত্তল হসপিটাল এন্ড নার্সিংহোমের রিসেপশনটা কোথায় একজনকে জিজ্ঞেস করতে সে দেখিয়ে দিল । দুজনে তাড়াতাড়ি করে রিসেপশনের মেয়েটির কাছে ডিটেলস বলে আইসিইউ রুমের লোকেশন জেনে তিনতলায় গেল। আইসিইউ-র রুমের সামনের সিটে একজন মাঝারি বয়সের ভদ্রমহিলা বিধ্বস্ত অবস্থায় মুখে হাত চাপা দিয়ে কেঁদে চলেছেন আর একজন ৫৫ বছর বয়স্ক ভদ্রলোক সামনেটা পায়চারি করছেন। শৌনক আর ইউসুফের বুঝতে অসুবিধে হয় না যে এনারাই অনিন্দিতার বাবা মা। শৌনক ওদের দেখে চুপ করে পিছিয়ে গেল সামান্য।
-‘ কি রে শৌনক দাঁড়িয়ে পড়লি কেন ? শরীর খারাপ লাগছে তোর? বসবি একটু?’ – ইউসুফ ওকে ধরে জিজ্ঞেস করল।
-- ‘না, আমি ঠিক আছি এবার অণুর বাবা-মা আমাকে পুলিশে দেবেন নিশ্চয়ই, খুব বকবেন কি বল ইউসুফ?
আর দেবেন নাই বা কেন আমিই যে অণুর এই অবস্থার জন্য দায়ী’।
--‘সবই জানিস যখন বলিস কেন আর এখন? যা হবে দেখা যাবে চল তো এখন। আমি তো আছি তোর জন্য আছি নাকি, নে চল এত ভাবিস না’।
সামনেটা যেতেই অনিন্দিতার বাবা এগিয়ে এসে বললেন- ‘ তোমাদের মধ্যে কেউ কি শৌনক নামে আছো, মুম্বাই থেকে এসেছ তোমরা?’
--ইউসুফ শৌনককে দেখিয়ে বলল ‘ এই যে কাকু এই শৌনক’।
--বাবা শৌনক , আমাদের মেয়েকে বাঁচাও। মেয়ে আমার তোমার নাম করে যাচ্ছে। কোথা থেকে কি যে হল বুঝে উঠতে পারলাম না। হার্টের রোগটা যে এত বেড়ে যাবে বুঝতে পারি নি আমরা। মেয়েটা বরাবরই চুপচাপ থাকে। ভাবতাম কবি মানুষ তাই চুপ করে ওর নিজের মধ্যেই থাকে। কয়েকদিন থেকে দেখতাম একটু বেশি চুপচাপ, চোখফোলা থাকত। ওকে জিজ্ঞেস করলে বলত কিছু হয় নি বাবা। একবার চেক আপ করাতে নিয়ে যাব ভাবলাম ওকে জানাতে সে কিছুতেই রাজি হল না। আমরা কোনদিনই মেয়ের ওপর কোনকিছুতেই চাপাচাপি করি নি। সেদিন জোর করলেই ভালো হত আজ এরকম দিন দেখতে হত না তাহলে’—কথাগুলো শেষ না করেই অনিন্দিতার বাবা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। অনিন্দিতার মা এগিয়ে এসে ওর বাবাকে ধরে বসাতে বসাতে শৌনকের দিকে তাকিয়ে বললেন-‘ যাও বাবা ভেতরে যাও, একবার দেখা করে এসো যদি কিছু পরিবর্তন হয়। ডাক্তার ৭২ ঘন্টা সময় দিয়েছেন’ বলে ওর মা কাঁদতে শুরু করলেন। ইউসুফ ওদের সামনে বসে পড়ল। সান্ত্বনা কি দেবে বুঝে উঠতে পারল না। শৌনক ভেতরে ঢুকল। অনিন্দিতার মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগান। ওর দুপাশে সব নাম না জানা ডাক্তারি মেশিনপত্র অণুর প্রাণ মাপছে। একদিকে স্যালাইনের বোতল ঝুলছে। অনিন্দিতার ফ্যাকাসে মুখটা শৌনক দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল। অনিন্দিতাকে দেখাশোনা করার দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সটা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল-‘ আপনি শৌনক?’
--‘হ্যাঁ, আমিই সেই হতভাগা’।
--‘আপনার নাম মাঝেই মাঝেই করছিল। সামনে গিয়ে কথা বলুন তবে বেশি কথা বলবেন না, উত্তেজিত করবেন না’।
নার্সটা বেরিয়ে গেলে শৌনক পাশের টুলটা টেনে অনিন্দিতার হাতটা নিয়ে নিজের দুহাতের মধ্যে রাখল। অনিন্দিতার মুখের সামনে ঝুঁকে শৌনক ডাক—‘অনু, আমার অণু, আমি এসেছি দেখো। চোখ খোল দেখো আমি তোমার শৌনক। দেখো একবার আমার দিকে। আমি খুব ভুল করে ফেলেছি বুঝতে পারি নি এতটা হতভাগা আমি যে যে পৃথিবীতে আছে তার ভালবাসা এড়িয়ে যে নেই তাকে নিয়ে হতাশ হয়ে ছিলাম। অণু মাফ করবে না আমায় চোখ খুলে দেখো একবার’। শৌনকের গাল বেয়ে দুফোঁটা চোখের জল অণুর গাল ছুঁল। কিছুক্ষণ পর অনিন্দিতা চোখ খুলে তাকাল। শৌনককে দেখে কি যেন বলতে গেল পারল না শুধু অণুর চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে বালিশে লাগল। শৌনক দেখল অণুর ফ্যাকাসে মুখ কিছুক্ষণের জন্য উজ্জ্বল হয়ে উঠল। কোন এক দিব্যজ্যোতির আলো যেন অনিন্দিতার মুখের মধ্যে এসে মিশেছে।
শৌনক পাথরের হয়ে নিশ্চুপ বোবার মত আইসিইউ এর বাইরে এসে সিটে ধপাস করে বসে পড়ল। অনিন্দিতার বাবা মা অবাক হয়ে শৌনকের কাছে গিয়ে অনিন্দিতার খবর জানতে চাইল। জবাব না পেয়ে ওনারা ভেতরে গেলেন। শৌনক জানলার বাইরে পলকহীনভাবে তাকিয়ে রইল। বাইরে আকাশভাঙা বৃষ্টি নেমেছে ভেতরেও একবৃষ্টি নামল।
--------------------------
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন